মানুষের মাঝে রক্তের নেশা কীভাবে এলো-বম জাতিসত্তার রূপকথা অবলম্বনে

Print Friendly

মানুষের মাঝে রক্তের নেশা কীভাবে এলো-বম জাতিসত্তার রূপকথা অবলম্বনে 

 

[বিদ্র: এটি বম জাতিসত্তার একটি রূপকথা।১৯৮৭ সালে মোনঘর আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত বিদ্যালয় বার্ষিকী(প্রকাশ কাল: ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৮৭) থেকে উপরের লেখাটি অনুলিখন করে নতুন করে লেখা হয়েছে। তবে রূপকথার মূল কাহিনীর কোনো পিরবর্তন করা হয়নি। রূপকথাটির মূল লেখক ছিলেন ভানরাম নাগ বোম(৯ম মান, মানবিক)। বিদ্যালয় বার্ষিকী নামক প্রকাশনাটির সম্পাদক ছিলেন, মৃত্তিকা রঞ্জন চাকমা; সহ সম্পাদক- অংছাইন চাক(১০ মান, বিজ্ঞান)]

সাহিত্য:

বম জাতিসত্তার একটি রূপকথা অবলম্বনে এই লেখা। রাজকুমার ও সূচ যুবক নামে একপি রূপকথা বম জাতিসত্তার মাঝে প্রচলিত রয়েছে।উক্ত রূপকথার কাহিনী আমরা আজ এখনে উপস্থাপন করলাম। মানুষের মাঝে রক্তের নেশা কীভাবে এসেছে তা এই কাহিনীতে উঠে এসেছে।

এক ছিলো রাজ্য

একদা একটি রাজ্য ছিলো। সেই রাজ্য ধনসম্পদে সমৃদ্ধ ছিলো। ছিলো রাজার সুরম্য রাজপ্রাসাদ। রাজার এক রাণী ছিলো। তাদের ছিলো দুই সন্তান। একটি রাজপুত্র এবং অন্যটি কন্যা।

রাজপুত্র ও রাজকন্যার বিদ্যা অর্জনের বয়স হলে রাজা ও রাণী তাদের দূর দেশে বিদ্যাশিক্ষা অর্জনের দূর দেশে পাঠিয়ে দেন।

 

রাজ্যে শুরু হলো রাক্ষসের উৎপাত

রাজ্যে রাজার প্রাসাদের সামনে ছিলো এক বিরাট আখ ক্ষেত। একদিন ক্ষেতে এক হরিণ আসলো। সেই হরিণ সবার অলক্ষ্যে আখ ক্ষেতের আখ সাবার করে চলে যেতো।

তা দেখে রাজা সেই হরিণকে মারার জন্য পরিকল্পনা নিলেন। কিন্তু হরিণটি ছিলো হরিণ ছদ্মবেশী এক রাক্ষস।

রাজা হরিণকে মারতে শত চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন। হরিণটিকে তিনি তাড়া করে বনের ভেতরে ঢুকলেন। এবার সুযোগ বুঝে হরিণটি রাক্ষসের বেশ ধারণ করে রাজাকে খেয়ে ফেললেন।

এভাবে রাক্ষসটি রাজ্যের সবাইকে খেয়ে ফেললো। এবার সে রাজপ্রাসাদে বসবাস করতে শুরু করলো। অপেক্ষা করতে লাগলো রাজুপুত্র ও রাজকন্যাকে।

এদিকে রাজপুত্র ও রাজকন্যা জানতে পারলেন তাদের পিতার রাজ্যে এক রাক্ষস সবাইকে খেয়ে সাবাড় করে ফেলেছে। নানা কথা চিন্তা ভাবনা করে তারা আর তাদের রাজ্যে ফিরে গেলেন না। তারা অন্য জায়গায় বসবাস করতে লাগলেন।

এদিকে রাক্ষসের প্রাণে আর তর সয় না। সে রাজপুত্র ও রাজকন্যা খেযে ফেলতে এবার তাদের খুজতে শুরু করলো।

 

রাক্ষসের সাথে রাজপুত্র ও রাজকন্যার দেখা

রাক্ষস রাজপুত্র ও রাজকন্যাকে তন্ন তন্ন করে খুজে হয়রান হয়ে গেল। বহুদিন খোজার পর তিনি এবার তাদের দেখা পেলেন। তখন রাজপুত্র ও রাজকন্যা দু’জনে একটি ঘোড়ায় চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। রাক্ষস তাদের দেখে তাড়া করলো।

রাক্ষসকে দেখে তারা ঘোড়া ছুটালেন। ঘোড়া ছুটতে ছুটতে হয়রান হয়ে গেল। রাক্ষস তাদের নাগাল পাবে এমন অবস্থা হলো।

কিন্তু একটি বড় গাছের নিচে এসে ঘোড়াটি এক অদ্ভুত কান্ড করে বসলো। গাছের নিচে এসেই ঘোড়াটি চারপাক দিয়ে এক লাফ দিলো। সে কি লাফ! এ যে যেমন তেমন লাফ নয়! এক লাফে ঘোড়াটি তিন মাইল দূরে পৌঁছে গেলো!

এদিকে রাক্ষস বড় গাছটির কাছে এসে দেখলো ঘোড়াটি শুন্যে উড়ে যাচ্ছে। একটি পাতা সেখানে পরে আছে। সেও ঘোড়াটির মতো চার পাক খেয়ে শুণ্যে লাফ দিলো! সে কি! সেও একলাফে তিন মাইল দূরে চলো গেলো।

এদিকে  রাক্ষস থেকে বাঁচতে আর উপায় না দেখে এক বিরাট বটগাছের নিচে এসে বটগাছকে লক্ষ্য করে বললো- তুমি যদি সত্যিই বটগাছ হয়ে থাকো তবে আমাদের বাঁচাও। সঙ্গে সঙ্গে বটগাছটি দুই ভাগ হলো। সেখানে তারা ঢুকে গেলো। কিন্তু ঘোড়াটি  ঢুকতে পারলো না।

রাক্ষস এসে ঘোড়াটিকে খেয়ে ফেললো। হাড়গোড় ফেলে চলে গেলো।

 

রাজকন্যা ও রাজপুত্র স্বপ্ন দেখলো

এরপর তারা বটগাছে থাকলো। সেখানে তারা দুইজনে এক স্বপ্ন দেখলো। স্বপ্নে কেউ একজন বললো যে, শুদ্ধ পবিত্র ঝরনার পানি পেলে ঘোড়াটি আবার জীবিত হবে। তারা দু’জনে পবিত্র ঝরনার পানির খোঁজে বেরিয়ে গেল।

চলতে চলতে এক ঝরনার ধারে গিয়ে তারা বললো।

ঝরনা, তুমি কি পবিত্র? তোমার পানি কি পবিত্র?

ঝরনা বললো- আজ পর্যন্ত আমাকে কেউ অপবিত্র করতে পারেনি।

এরপর তারা সেই ঝরনা থেকে পাতায় ভরে পানি এনে ঘোড়ার হাড়গোড়ে পানি ছিটিয়ে দিলে সত্যি সত্যিই ঘোড়াটি জীবিত হয়ে আবার আগের মতো হয়ে উঠলো।

 

সূচরূপী এক দুষ্ট যবকের সাথে দেখা

এরপর তারা দু’জন ঘোড়ায় করে ঘুরতে ঘুরতে এক নির্জন স্থানে এসে পৌঁছলো। সেখানে তারা একটি ঘরের দেখা পেল। সেখানেই তারা রাত কাটালো। বাড়িটি ছিলো সূচ রূপধারী এক দুষ্ট যুবকের। সে দিনে সূচ হয়ে থাকতো। আর রাত হলেই যুবক রূপ ধারণ করতো।

রাতে সূচ রূপধারী যুবকটি রাজকন্যার সাথে ভাব জমালো।

পরদিন রাজপুত্র রাজকন্যাকে অন্য জায়গায় চলে যেতে বললে, রাজকন্যা যেতে রাজি হলো না। অগত্যা রাজপুত্র ও রাজকন্যাকে সেখানে কয়েকদিন থাকতে হলো। এভাবে দিন যায়। ক্রমে সূচ যুবকের সাথে রাজকন্যার ভাব গভীর হলো। এবার সে তার রাজপুত্রকে কীভাবে দূর করা যায় তার চিন্তা করতে শুরু করলো।

সূচ যুবক বললো, তোমার ভাইকে মেরে ফেলতে হবে।

রাজকুমারী বললো- কীভাবে?

সূচ যুবক বললো- তাকে পেয়ারা আনতে বলবে। পেয়ারা গাছে একটি দানব থাকে। সে যখন পেয়ারা আনতে যাবে। দানবটি তাকে খেয়ে ফেলবে।

এভাবে দুষ্ট সূচ যুবকের কথামতো রাজকন্যা রাজপুত্রকে বললো যে, সে পেয়ারা খেতে চায়। রাজপুত্র পেয়ারা আনতে গেল। রাজপুত্রকে দেখে দানবটি পেয়ারা ছুড়তে লাগলো। রাজপুত্র ঘোড়াটিকে এক বিকট চিৎকার করতে বললো। ঘোড়াটি বিকট চিৎকার করলে দানবটি চোখ উল্টে মারা গেল।

এরপর সে রাজকন্যার জন্য পেয়ারা নিয়ে গেল।

এবা রসূচ যুবক বললো- তার ভাইকে বলতে আনারস বাগান থেকে আনারস এনে দিতে। সেখানে দুই মাথাবিশিষ্ট দানব থাকে। দানবটি রাজপুত্রকে মেরে ফেলবে এই আশাই তার ছিলো।

কিন্তু রাজপুত্র আানারস আনতে গেলে দানবটিকে সে ঘোড়ার বিকট চিৎকার ধ্বনি দিয়ে মেরে ফেললো।

এবার সূচ যুবক বললো- রাজকন্যা যেন রাজপুত্রকে কাঁঠাল গাছ থেকে কাঁঠাল আনতে বলে। সেখানে তিন মাথাবিশিষ্ট এক দানব থাকে।

রাজকন্যার অনুরোধে রাজপুত্র আবার চললো কাঁঠাল আনতে। এবার দানবটি ঘোড়ার চিৎকার শুনে রাজপুত্র থেকে প্রাণ ভিক্ষা চাইল। রাজপুত্র তাকে প্রাণ ভিক্ষা দিল। তাদের দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব হলো।

রাজপুত্র জলপরীর হাতে বন্দী হলো

পরপর তিনবারের মতো রাজপুত্রকে মারতে না পারায় এবার সূচ বললো, দূরে পুকুরের মাঝখানে এক সুপারি গাছ আছে। সেখান থেকে তুমি তোমার ভাইকে সুপারি আনতে বলবে। সে সুপারি আনতে গেলে অবশ্যই মারা পড়বে।

রাজকন্যা সূচ দুষ্ট যুবকের কথামতো রাজপুত্রকে সুপারি আনতে বললো।

রাজপুত্র রওনা দিলো সুপারি আনতে। সে জলে নেমে সুপারি গাছের গোড়ায় গিয়ে গাছের উপর উঠলো। পুকুরটি ছিলো জলপরী ও দেবতাদের আবাসস্থল। জলপরী রাজপুত্রকে দেখে প্রেমে পড়লো। সে সুপারি গাছে এক ঝাঁকি দিলো। অপ্রস্তুত রাজকুমার সুপারি গাছ থেকে ঝুপ করে পানিতে পড়ে গেল। এবার জলপরী রাজপুত্রকে বন্দী করে সিন্ধুকে ভরে রাখলো।

এসব দেখে ঘোড়াটি দানবের কাছে সাহায্য চাইল। তারা দুইজনে মিলে রাজপুত্রকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করলো। দানব পানি সেচতে শুরু করলো। আর ঘোড়া অদ্ভুত আওয়াজ করা মাত্রই পানি অর্ধেক শুকিয়ে গেল। অর্ধেক দেবতা অচেতন হলো। আবার ডাক দিতে না দিতেই সব পানি শুকিয়ে গেল। এবার জলপরী ও দেবতারা তাদের কাছ থেকে মাপ চাইল। এবং তারা রাজপুত্রকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো।

রাজপুত্র মুক্তি পেলো। সে সুপারি গাছ থেকে সুপারি এনে রাজকন্যাকে দিলো।

দুষ্ট সূচ যুবক ধরা পড়ল

সুপারি এনে দেবার পরে রাজপুত্র রাজকন্যাকে বললো- চলো, আমরা এবার এখান থেকে চলে যাই। কিন্তু রাজকন্যা বললো, যে সে যাবে না।

রাজপুত্র বললো- ঠিক আছে তবে আমি চলে যাচ্ছি। এবং সে চলে গেল। তবে সে আসলে চলে যাবার ভান করেছিল। সে  লুকিয়ে রইল। এবং রাতে বের হয়ে বাড়িতে এসে দেখলো, রাজকন্যা অপরিচিতি এক যুবকের সাথে কথা বলছে। ঠিক এসময় সে ঘরে ঢুকলো। অমনি সূচ যুবক সূচে পরিণত হলো। রাজকন্যা তাকে লুকিয়ে রাখলো।

রাজপুত্র রাজকন্যাকে বললো, অবিলম্বে যুবককে বের করে দিতে।

ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে রাজকন্যা দুষ্ট সূচ যুবককে বের করে দিতে বাধ্য হলো।

রাজপুত্র তাকে একটি পাথরে আছাড় মারলো। তিনবার আছাড় মারতেই সূচ থেকে অবিরল রক্ত ঝরতে শুরু করলো। গল গল করে রক্ত ঝরতে ঝরতে পুরো এলাকা ডুবে গেল। তারপর সারা রাজ্য রক্তে ভরে গেল। তারপরও গল গল করে রক্ত ঝরা থামলো না। অন্য রাজ্যেও তখন রক্ত বেয়ে চলে গেল। এভাবে সারা দুনিয়া রক্তে ভরে গের। পশু পাখি প্রাণী মারা গেল।

সৃষ্টি হলো নতুন মানুষ, তাদের থেকে গেল রক্তের নেশা

তারপর বহুদিন পরে রোদের তাপে একসময় রক্ত শুকিয়ে গেল।

আবার সেই রক্তেভরা মাটি থেকে নতুন মানুষের সৃষ্টি হলো। রক্তেভরা মাটি থেকে এই নতুন মানুষ সৃষ্টি হবার কারণে তারা আর রক্তের কথা ভুলতে পারলো না। তাদের মাঝে রক্তের নেশা থেকে গেল।

এবং এই রক্তের নেশার কারনেই মানুষ এখনো নিজেদের মাঝে যুদ্ধ করে, হত্যা করে, মারামারি করে এবং রক্তপাত ঘটিয়ে আনন্দ পায়, তৃপ্তি পায়।

এভাবেই মানুষের মাঝে রক্তের নেশা আসলো!

 

বিদ্রঃ- এই লেখাটি সিএইচটি ২৪ ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি কপি/পেষ্ট করা হয়েছে।

লিংকঃ- www.cht24.com/08/08/2013/3696

Share This Post

Post Comment

Please Answer.. * Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.